ঢাকা , সোমবার, ২৩ মার্চ ২০২৬ , ৯ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

​হাকালুকি হাওরে পাখি শিকার চক্র: নির্মম নির্যাতনের শিকার বন্যপ্রাণী, হুমকিতে জীববৈচিত্র্য

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট সময় : ২০২৬-০৩-২৩ ১৩:০৯:৫৭
​হাকালুকি হাওরে পাখি শিকার চক্র: নির্মম নির্যাতনের শিকার বন্যপ্রাণী, হুমকিতে জীববৈচিত্র্য ​হাকালুকি হাওরে পাখি শিকার চক্র: নির্মম নির্যাতনের শিকার বন্যপ্রাণী, হুমকিতে জীববৈচিত্র্য


এস. এম. জালাল উদদীন, মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধি: 


দেশের অন্যতম বৃহৎ জলাভূমি আজ ভয়াবহভাবে হুমকির মুখে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের জন্য পরিচিত এই হাওরে সক্রিয় হয়ে উঠেছে পাখি শিকারি চক্র। সাম্প্রতিক সময়ে পাখি নিধনের যে নির্মম চিত্র সামনে এসেছে, তা শুধু পরিবেশের জন্য নয়, মানবিক মূল্যবোধের জন্যও গভীর উদ্বেগের বিষয়।

সম্প্রতি -এর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে হৃদয়বিদারক এক ঘটনা। মৌলভীবাজারের -এর সিংহনাদ জগৎপুর এলাকায় শিকারিরা একটি ঘুঘু পাখির চোখের পাতা সেলাই করে, ডানা ও লেজ কেটে দিয়ে জীবন্ত টোপ হিসেবে ব্যবহার করছিল। নিষ্ঠুর এই পদ্ধতিতে অসহায় পাখিটিকে আটকে রেখে অন্য পাখিদের ফাঁদে ফেলা হচ্ছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাকালুকি হাওর শুধু একটি জলাভূমি নয়, এটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মৎস্যভাণ্ডার এবং পাখির অভয়ারণ্য। শীত মৌসুমে এখানে প্রায় ২০০-২৫০ প্রজাতির দেশি-বিদেশি পাখির আগমন ঘটে, যার মধ্যে রয়েছে বিপন্ন প্রজাতিও। এসব পাখি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে হাওরের বিভিন্ন এলাকায় জাল, ফাঁদ, বৈদ্যুতিক শক এবং বিষটোপ ব্যবহার করে পাখি শিকার করছে। শিকার করা পাখি স্থানীয় বাজারে বিক্রি হচ্ছে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে এগুলোকে বিলাসবহুল খাবার হিসেবেও পরিবেশন করা হচ্ছে। প্রতিদিন শত শত পাখি এভাবে নিধন হচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের অনুযায়ী বন্য পাখি ধরা, হত্যা করা বা বন্দী রাখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবুও প্রকাশ্যে এমন কার্যক্রম চলতে থাকায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

পরিবেশবিদরা বলছেন, হাকালুকি হাওরের মতো একটি আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমিতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকলে তা শুধু পাখির অস্তিত্ব নয়, পুরো বাস্তুতন্ত্রের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে। পাখি কমে গেলে কৃষিজমিতে কীটপতঙ্গের আক্রমণ বাড়বে, খাদ্যশৃঙ্খলে ভারসাম্য নষ্ট হবে এবং জলজ সম্পদের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, সমস্যার মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে দারিদ্র্য ও বিকল্প জীবিকার অভাব, আইন প্রয়োগের দুর্বলতা, 
স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতার ঘাটতি ও প্রভাবশালী চক্রের সম্পৃক্ততা। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এর মধ্যে রয়েছে হাওর এলাকায় নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, বন বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ টহল জোরদার
স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে কমিউনিটি-ভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি করে শিকার নির্ভরতা কমানো, স্কুল-কলেজ পর্যায়ে পরিবেশ শিক্ষা জোরদার।

এদিকে উদ্ধার হওয়া আহত ঘুঘু পাখিটির চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে একটি পাখি উদ্ধার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। এই নিষ্ঠুরতার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে হাকালুকি হাওরের আকাশ একদিন সত্যিই পাখিশূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রকৃতি রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো শুধু বইয়ের পাতাতেই দেখবে এই পাখিদের বাস্তবে নয়।

নিউজটি আপডেট করেছেন : [email protected]

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ